২২। গীবত ও চুগলখুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
২২। গীবত ও চুগলখুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মানুষের পাপ গোপন রাখার গুরুত্ব

মানুষের পাপ গোপন রাখার গুরুত্ব

মানুষের পাপ গোপন রাখার গুরুত্ব
"যারা পছন্দ করে যে,ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার লাভ করুক,নিঃসন্দেহে ইহাকাল ও পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ্ জানেন,তোমরা জানো না”। [সূরা আন-নূর; ২৪:১৯]

প্রিয় নবী (সা) আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই শিক্ষা দিয়েছেন যার একটি হল অন্যের পাপ গোপন রাখা। আমাদের মাঝে কেউ যদি এমন কোন খারাপ কাজ করে বসে যা কিনা আল্লাহ্‌র আদেশ বিরুদ্ধ বা নৈতিক চরিত্র বিরুদ্ধ কিংবা অন্যের জন্য মর্যাদাহানিকর, সেক্ষেত্রে তার উচিৎ তা গোপন রাখা এবং কৃতকর্মের জন্য একান্ত নিভৃতে আল্লাহ্‌র কাছে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করা। প্রিয় নবী (সা) বলেছেন,
“আমার সমগ্র উম্মাহ্‌ নিরাপদ, কেবল তারা ব্যতীত যারা কিনা তাদের পাপ নিয়ে দম্ভ করে বেড়ায়। তাদের কেউ যখন কোন কুকর্ম করে রাতে ঘুমাতে যায় এবং আল্লাহ্ তার পাপ গোপন রাখেন, সকালে ঘুম থেকে উঠার পর সে বলতে থাকে, “এই শোন, আমি না কাল রাতে এই এই (কুকর্ম) করেছি”। সে যখন ঘুমাতে যাই, আল্লাহ্ তার পাপ গোপন রাখেন, আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই আল্লাহ্ যা গোপন রেখেছিলেন তা সে লোকজনের কাছে প্রকাশ করে বেড়ায়”।[সহীহ আল বুখারী]

জায়িদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত,
“আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) এর সময়ে এক লোক যখন স্বীকার করল যে, সে ব্যভিচার করেছে, তখন আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) একটি চাবুক চাইলেন। যখন তাকে একটি ছেঁড়া/পুরানো চাবুক দেওয়া হল তিনি বললেন, “এটার চেয়ে ভাল নেই?” তখন একটি নতুন চাবুক আনা হলে তিনি বললেন, “এটার চাইতে একটু পুরাতন দেখে নিয়ে আস”। এরপর এমন একটা চাবুক আনা হল যেটা ছিল (ব্যবহারের ফলে) একটু পুরানো/নরম। তখন তিনি ওটা দিয়ে ওই ব্যক্তিকে একশো দোর্‌রা মারার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি বললেন, “হে লোকেরা! তোমরা আল্লাহ্‌র সীমা অতিক্রম করোনা। কেউ এই ধরনের ঘৃণিত কোন অপরাধ (যেমন ব্যভিচার) করে বসলে, সে যেন তা গোপন রাখে, কারন কেউ যদি তা প্রকাশ করে বসে, তবে আমরা তার ব্যাপারে বর্ণিত শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র কিতাবের বিধান কার্যকর করব”। [মুসনাদ আহমদ]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, 
“একজন লোক রাসূল (সা) এর নিকট আসেলেন এবং বললেন:
“হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমি মদিনার থেকে দূরবর্তী এক স্থানে এক মহিলার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছি। সুতরাং, আমাকে আমার প্রাপ্য শাস্তি দেন’। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) তখন বললেন: 'আল্লাহ্ তো তোমার পাপ গোপন রেখেছিল, তবে কেন তুমি তা গোপন রাখলেনা?’”  [সহীহ্‌ মুসলিম]

একইভাবে, যদি কেউ অন্যের পাপের কথা জেনে থাকে তবে তার উচিৎ তা গোপন রাখা। রাসূল (সা) বলেন:
"যে ব্যক্তি দুনিয়ায় একজন মুসলমানের একটা কষ্ট দূর করবে, হাশরের দিন আল্লাহ্ও তার একটা কষ্ট দূর করে দিবেন;  যে একজন ঋণগ্রস্তকে ঋণমুক্ত করবে, আল্লাহ্ তার দুনিয়া আর আখিরাত দুটোই সহজ করে দিবেন; আর যে ব্যক্তি একজন মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, দুনিয়া আর আখিরাত দুই জায়গাতেই আল্লাহ্ তার দোষ গোপন রাখবেন।" [ সহীহ্‌ মুসলিম]

আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত,
"রাসূল (সা) একবার মীম্বরে দাড়িয়ে উচ্চস্বরে বললেন, "হে লোকেরা, যারা কিনা ইসলামকে শুধুমাত্র মুখে গ্রহন করেছ কিন্তু অন্তরে ঈমান আননি এখনো, তোমরা মুসলমানদের অনিষ্ট করা থেকে বিরত থাক, বিরত থাক তাদের ঠাট্টা করা থেকে, আর বিরত থাক তাদের ভুলত্রুটি বলে বেড়ানো থেকে, কারন যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ অন্বেষণ করে বেড়ায় আল্লাহ্ও তার দোষ অন্বেষণ করবেন এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিবেন, এমনকি যদি নিভৃতে কোন এক গৃহকোণেও সংঘটিত হয়ে থাকে পাপটি।" [সহীহ্‌ আল জামী]

ইমাম আন-নাওয়াবী (রঃ) লিখেছেন, 'এই হাদিস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, শুধুমাত্র মুনাফিক আর দুর্বল ঈমানের লোকেরাই মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং তা প্রকাশ করে বেড়ায়... "

লজ্জা আর অপমানের ভয় অনেকসময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এই ভয়টাই একদিন তাকে আল্লাহ্‌র দিকে নিয়ে যাবে, যখন সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু যখন তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয় তখন সেই ভয়টা আর তার মাঝে কাজ করে না । সে তখন ভাবতে থাকে, ‘কি হবে আর ভাল থেকে, ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই গেছে, লোকজন তো জেনেই গেছে ইতোমধ্যে’, তখন সে প্রাকাশ্যে পাপ কাজে লিপ্ত হতে থাকবে।

তাছাড়া বারবার পাপের কথা বলতে থাকলে মানুষের অন্তর থেকে পাপের ভয় দূর হয়ে যায়। তখন পাপকে আর পাপ বলে মনেই হয়না। যে পাপের কথা বলে বেড়াতে লজ্জাবোধ করেনা, একই পাপে লিপ্ত হওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। আর এভাবেই সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে!

তাই এক মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে পাপ করতে দেখলে তার উচিত তা গোপন রাখা। সেই পাপ প্রকাশ করে দিয়ে লোকজনকে পাপের দিকে ঠেলে দেওয়া তার পক্ষে সমীচীন নয়। আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে শুধুমাত্র গুনাহগারদেরকেই সতর্ক করেননি, যারা গুনাহের কথা বলে বেড়ায় তাদেরকেও সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
“যারা পছন্দ করে যে,ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার লাভ করুক, নিঃসন্দেহে ইহাকাল ও পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ্ জানেন,তোমরা জানো না”। [সূরা আন-নূর; ২৪:১৯]

সূরা আন-নিসা এর মধ্যে আল্লাহ্ বলেনঃ
“আল্লাহ্ কোন মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারো প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ্ শ্রবণকারী,বিজ্ঞ”। [সূরা আন নিসা, ৪:১৪৮]

ইবনে আব্বাস (রা) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
"আল্লাহ্ পছন্দ করেন না যে, আমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে বদ্‌দোয়া বা মন্দ বিষয় প্রকাশ করি, যদি না আমাদের উপর অন্যায় করা হয়। তবে যদি কারো উপর জূলূম করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে এই ব্যাপারে আল্লাহ্‌র অনুমতি রয়েছে। তারপরও এই ব্যপারে ধৈর্য ধারন করাই উত্তম।" [তফসীর ইবনে কাসীর]

সমাজে আজ এতো ব্যাপকভাবে পাপ ছড়িয়ে পড়ার কারন হল আমরা রাসূল (সা) এর দেওয়া শিক্ষার কথা ভুলে গেছি যার শিক্ষা ছিল নিজের আর অন্যের মন্দ বিষয় প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার। আজ সে কারনেই মানুষের অন্তর থেকে গুনাহের ভয় উড়ে গেছে- হোক সেটা ছোট গুনাহ্‌ বা বড় গুনাহ্‌। আরো ভয়ঙ্কর হল, মানুষ আজকাল তাদের নিজের পাপের কথা গর্বভরে প্রচার করতে পছন্দ করে! একবারও কি ভেবে দেখেছি কোথায় চলে গেছি আমরা!!

আজকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির নামে সমাজে কতভাবে যে পাপ ছড়িয়ে পড়ছে তার কোন ইয়াত্তা নেই। ইন্টারনেট, বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা এবং রেডিও-টেলিভিশনের প্রোগ্রামগুলোতে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, ব্যভিচার, দুর্নীতি, বাটপারি আর মারামারি ছাড়া ভাল কোন খবরই পাওয়া যায়না আজকাল। মিডিয়া-যার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে সবচাইতে বড় ভুমিকা রাখার কথা ছিল-তাই আজ সমাজে অন্যায়কে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করছে। কয়েকবছর আগেও আমরা যেসব অপরাধের কথা কল্পনা করতে পারতাম না, সেগুলোই আজ মিডিয়ার কল্যাণে নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে! তাই মুসলিম ভাইদের প্রতি অনুরোধ, আসুন, মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এমন সকল পথ পরিহার করে চলি আমরা; বিরত থাকি নিজের বা অপরের দোষ প্রচার করা থেকে; পানাহ্‌ চাই আল্লাহ্‌র কাছে, আল্লাহ্ যেন আমাদের সকলকে এমন ঘৃণিত অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।

ধৈর্যসহকারে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। জাযাকাল্লাহু খাইরান!

References: Lecture by Allama Ehsan Ilahi Zaheer (rahimahullah), Qawaaid wa-Fawaaid min al-Arabeen an-Nawawi by Shaikh Nathim Sultan, Tafseer Ibn Katheer, and others.

অনুবাদঃ মুনিমুল হক
সম্পাদনাঃ আবদ্‌ আল-আহাদ এবং শাবাব শাহরিয়ার খান

গীবত করার ভয়বহতা/ গীবত একটি মারাত্মক কবিরা গুনাহ

গীবত একটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ্‌


মানুষ সামাজিক জীবসমাজবদ্ধ জীবনযাপন ছাড়া একাকী জীবন যাপন করা মানুষের পক্ষে সহজ নয়, তেমনটি কেউ কামনাও করে না। আবার পরিচিত সমাজের বাইরেও মানুষের পক্ষে চলা খুবই কঠিনপৃথিবীর সমাজবদ্ধ কোনো মানুষই সামাজিক বিপর্যয় কামনা করতে পারেন নামানুষ সব সময় সুখ ও শান্তি চায়শান্তি মানুষের একটি আরাধ্য বিষয়কিন্তু এই প্রত্যাশিত সুখ-শান্তি নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরউঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র­ এসব পার্থক্যই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেনমানুষের পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যই এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতে এরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿13﴾
হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছিযাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারতোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ননিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ১৩)
সুতরাং মানব সমাজের এই পার্থক্য সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তেইযেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গীবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করেতাই তো মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এই নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেনএ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেন,
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
আর তোমরা কেউ কারো গীবত করো না, তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে ? একে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে, (সূরা হুজুরাত:১২)
সুস্থ, স্বাধীন কোনো বিবেকবান মানুষই জ্ঞান অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করবে নাঅথচ মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিমজ্জিত হয়

গীবত কী?
গীবত শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি।
পরিভাষায় গীবত বলা হয় তোমার কোনো ভাইয়ের পেছনে তার এমন দোষের কথা উল্লেখ করা যা সে গোপন রেখেছে অথবা যার উল্লেখ সে অপছন্দ করে(মুজামুল ওয়াসিত) গীবতের সবচেয়ে উত্তম ও বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিম্মোক্ত হাদিস থেকে পেতে পারি
সাহাবি আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
গীবত কাকে বলে, তোমরা জান কি? সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই ভালো জানেনতিনি বললেন, তোমার কোনো ভাই (দীনি) সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবতসাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ। (মুসলিম)
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোনো ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলা গীবত যা সে অপছন্দ করে

গীবতের পরিণাম
গীবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্তএ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ ﴿1﴾
ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়’ (সূরা হুমাজাহ-১)
কেউ গীবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধ করবে সাধ্যমতোআর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তবে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবেকেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনা নিজে গীবত করার মতোই অপরাধহাদিসে আছেসাহাবি মায়মুন রাঃ বলেন,
একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছেআমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছআমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনিসে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিককিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামারতারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিলআমি জিবরীল আঃ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত। (মাজহারি)
আবু সায়িদ ও জাবের রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
গীবত ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহসাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিভাবে? তিনি বললেন, ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়কিন্তু গীবত যে করে তার গোনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হয় না
সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হল যে, গীবত একটি জঘন্য পাপাচারএ থেকে সবাইকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে

যাদের দোষ বর্ণনা করা যায়
গীবত নিঃসন্দেহে হারামতারপরও যাদের দোষ বর্ণনা করা যায় তা হচ্ছে­
·       কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী প্রতিকারের আশায় বর্ণনা করা
·       সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা
·       ফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া ও - প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি
·       আবার যাদের স্বভাব গীবত করা তাদের সম্পর্কে অন্যদের সাবধান করার জন্য তার দোষ বর্ণনা করা জায়েজযেমন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একদা এক ব্যক্তি (মাখরামা ইবনে নওফেল) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করলেনতখন তিনি বললেন, তাকে আসার অনুমতি দাও, সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোকঅতঃপর তিনি তার সাথে প্রশস্ত চেহারায় তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেনঅতঃপর লোকটি চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন, অতঃপর আপনিই প্রশস্ত চেহারায় তার প্রতি তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেনএ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি কখনো আমাকে অশ্লীলভাষী পেয়েছ ? নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক নিকৃষ্ট সেই লোক হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করেছে। (বুখারি, মুসলিম)

গীবত করার কারণ
মানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজাএটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেতখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকেফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা-বিদ্বেষআবার হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হবে, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করেসুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে

বেঁচে থাকার উপায়
গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরিএ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হচ্ছে অপরের কল্যাণ কামনা করাকেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা
দ্বিতীয়ত, আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়াযেমন আল্লাহ সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ﴿9﴾
তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে
তৃতীয়ত, অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া
চতুর্থত, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা

শেষ কথা আমাদের সব সময় আল্লাহতায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে তিনি যেন অনুগ্রহ করে গীবতের মতো জঘন্য সামাজিক ব্যাধিতে আমাদের নিমজ্জিত হতে না দেন ক্ষেত্রে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সর্বাগ্রেকেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমানি কাজে পরিচালিত করো নাকেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকবকিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। (তিরমিজি)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন,
যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো’ (বুখারি)
সমাপ্ত

লেখক : চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ
সম্পাদক : ইকবাল হোছাইন মাছুম
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআর

চুগলখোরী বা গীবত এর ভয়াবহতা

নামীমা বা চোগলখুরি ও গীবত এর ভয়া বহতা

   
নামীমা বা চোগলখুরি
একজনের কথা-ঝগড়া বিবাদ, মনোমালিন্যের উদ্দেশ্যে অন্যের কাছে লাগানোই ইসলামের পরিভাষায় নামীমা বা চোগলখুরি বলে। সকল ইসলামী চিন্তাবীদ এ সম্পর্কে একমত পোষণ করেন যে, চোগলখুরি সম্পুর্ণ হারাম।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, 
“সে ব্যক্তির অনুসরণ করো না, যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে অসাক্ষাতে নিন্দা করে, যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগায়।” [সুরা আল কালাম ১০ -১১]

রাসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন ,
“চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” [বুখারি,মুসলিম,আবু দাউদ,তিরমিযি]

অপর এক হাদীসে বর্ণিত, একবার রাসুল(সা) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাবার সময় বললেন, 
“এ দুটি কবরের অধিবাসীরা আযাবরত অবস্থায় ভুগছে। কিন্তু কোন বড় ধরণের গুনাহের জন্য তারা শাস্তিতে ভুগছে না। একজন পেশাব করে ভালোমত পবিত্র হত না। আর একজন চোগলখুরি করে বেড়াত। “

এরপর তিনি খেজুরের দুটি কাঁচা ডাল নিয়ে উভয়ের কবরে একটি করে গেড়ে দিয়ে বললেন, “ডাল দুটি না শুকানো পর্যন্ত হয়তো এদের শাস্তি কম হবে।”
এ হাদীসে, “কোন বড় ধরণের গুনাহের জন্য তারা শাস্তি ভুগছে না” এ উক্তির অর্থ একটাই, তাদের ধারণায় তাদের কৃত গুনাহ তেমন বড় ছিল না। এজন্য কোন কোন বর্ণনাতে রয়েছে, রাসুল(সা) বলেছেন, “তবে অবশ্যই তা কবীরা গুনাহ ছিল”।

রাসুল(সা) বলেছেন, 
“তোমরা সবচেয়ে অধম লোক দেখতে পাবে সেই ব্যক্তিকে, যে বিভিন্ন জনের কাছে গিয়ে নিজেকে বিভিন্নভাবে বা বিভিন্ন আকারে প্রকাশ করে। আর যে ব্যক্তি পৃথিবীতে দ্বিমুখী আচরণ করবে , কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে দুটি আগুনের জিহ্বা দিবেন।” [বুখারি,মুসলিম,মুয়াত্তা]

দ্বিমুখী আচরণ দ্বারা এখানে দুজনের সাথে দুধরণের কথা বলার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বলেছেন ,
”দ্বিমুখী লোক বলতে সাধারণত চোগলখোরকে ধরে নেয়া হয়, যে ব্যক্তি একজনকে গিয়ে বলে ;অমুক তোমার সম্পর্কে এরুপ কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট দুপক্ষের যে কোন পক্ষ অথবা তৃতীয় কোন পক্ষ যে গোপনীয় বিষয় অপছন্দ করে তা প্রকাশ করা। প্রকাশিত ব্যাপারটি কারো কথা, কাজ বা কোন দোষ ত্রুটি যাই হোক না কেন । অতএব চোগলখুরি হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কেউ বা তৃতীয় কেউ অপছন্দ করে এমন তথ্য ফাঁস করা। মানুষের যে অবস্থা দৃষ্টিতে পড়ুক না কেন, তা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করায় যদি কল্যাণ না হয় এবং এর দ্বারা সমাজকে কোন গুনাহ থেকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।”

ইমাম গাযযালী (রহ) বলেন, 
“যার কাছে কেউ চোগলখুরি করে এবং বলে, অমুক তোমার সম্পর্কে এসব কথা বলেছে তখন তার উচিত ছয়টি কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করা।

এক তাকে অবিশ্বাস করবে, কেননা সে একজন চোগলখোর ও ফাসিক। সে ব্যক্তি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
দুই এসব কাজ থেকে তাকে বিরত থাকতে বলবে। কাজটির জন্য কঠোর সমালোচনা করে সদুপদেশ দান করবে।
তিন মন থেকে তাকে ঘৃণা করবে। কেননা সে আল্লাহর কাছে ঘৃণিত। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে ঘৃণিত ব্যক্তিকে ঘৃনা করা ওয়াযিব বলে গণ্য।
চার যে ব্যক্তি সম্পর্কে চোগলখোর খারাপ ধারণা দিয়েছে তার সম্পর্কে তাৎক্ষণিক খারাপ ধারণা করা ঠিক হবে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ”তোমরা অধিক ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা কিছু কিছু ধারণায় গুনাহ সংঘটিত হয় ”।
পাঁচ, তার বর্ণিত তথ্য এতটা গুরুত্বো দেবে না, তার সত্যাসত্য তদন্ত করতে আরম্ভ করবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন , “তোমরা কারো দোষ অন্বেষণের ক্ষেত্রে গোয়েন্দাগিরি করার চেষ্টা করবে না।”
ছয়, চোগলখোরকে দেয়া উপদেশ নিজেই যেন লংঘন না করে। চোগলখোর যা বলেছে তা নিয়ে সে যেন অন্যের সাথে সমালোচনা না করে।

হযরত উমার ইবন আব্দুল আযিয(রহ) কে এক ব্যক্তি কারো সম্পর্কে একটি খারাপ সংবাদ দিলে তিনি বলেন, 
তুমি যদি চাও তাহলে তোমার খবরটা নিয়ে অগ্রসর হই। তুমি যদি সত্যই বলে থাকো তাহলে তোমার উপর এ আয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে, “তোমাদের কাছে কোন ফাসিক যদি কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা নিয়ে তদন্ত করতে থাকো”। আর যদি তুমি মিথ্যাবাদী হউ, তাহলে তোমার উপর এ আয়াতের বিধান কার্যকর হবে, “যে পশ্চাতে নিন্দা করে, যে একের কথা অপরের কাছে লাগায়।”
আর যদি তুমি চাও তো তোমাকে ক্ষমা করে দিই। সে বলল, আমিরুল মুমিনুন আল্লাহ ক্ষমা করুন, আমি এই কাজ আর কখনো করব না বলে প্রতিজ্ঞা করছি।”

হযরত হাসান বসরী(রহ) বলেন, 
তোমার কাছে যে ব্যক্তি অন্যের কথা লাগায় জেনে রাখবে, সেও তোমার কথা অন্যের কাছে লাগায়।

এক ব্যক্তি এক বিশিষ্ট আলেমের কাছে এসে অপর এক ব্যক্তির নামে বিভিন্ন দুর্নাম করতে থাকলে তখন এ আলেম বললেন, 
“তুমি আমার কাছে তিনটি অপরাধ করেছ।
প্রথম, আমার এক দ্বীনী ভাইয়ের প্রতি আমার মনে ক্ষোভ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছ।
দ্বিতীয়, তার কারণে আমার মনকে দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত করেছ।
তৃতীয়, তুমি আমার কাছে বিশ্বস্ততা হারিয়েছ।

এক ব্যক্তি হযরত আলী ইবন আবি তালিব (রা ) এর নিকট এসে বলল, 
অমুক আপনার নামে কুৎসা রটিয়েছে ও গালি দিয়েছে। তিনি বললেন, আমাকে তার কাছে নিয়ে চল। সে তাকে ওই ব্যক্তির কাছে নিয়ে গেল। লোকটি ভেবেছিল হযরত আলী তার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। কিন্তু তিনি তাকে গিয়ে বললেন, “হে ভাই ! তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আমি ক্ষমা চাই। আর যদি মিথ্যা হয় তাহলে আল্লাহর কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাই”। তখন লোকটি বলল, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, এমন কাজ আমি আর কখনো করব না।

কোন কোন তাফসীরকার সূরা লাহাবের যে স্থানে আবু লাহাবের স্ত্রীকে “হাম্মালাতাল হাতাব” (জ্বলন্ত কাঠ বহনকারী) বলা হয়েছে, এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, সে ছিল একজন চোগলখোর। চোগলখুরি স্বভাবটাকে কাষ্ঠ বলে হয়েছে কেননা কাঠ যেমন আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে, তেমনি চোগলখোর দুজনের মধ্যে বিবাদের প্ররোচনা দানে অধিক পরিমাণে সাহায্য সহায়তা করে।

চোগলখোরের কার্যক্রম শয়তানী কার্যক্রম অপেক্ষাও অধিক ক্ষতিকর। কেননা, শয়তানী কার্যক্রম সংঘটিত হয় ওয়াস ওয়াসার মাধ্যমে, আর চোগলখুরির কার্যক্রম চলে মান সম্মান হানির দ্বারা।

একবার এক ব্যক্তি দেখতে পেল বাজারে একজন নিজের দাস বিক্রি করছে। বিক্রেতা এভাবে হাকডাক করছে “এ গোলামের একটু চোগলখোরি ব্যতীত আর কোন ত্রুটি নেই”। লোকটি এ দোষটি গুরুত্ব না দিয়ে গোলামটিকে কিনে নিল। গোলামটি তার বাড়িতে অবস্থান করতে লাগল। কিছুদিন পর সে তার মনিবের স্ত্রীকে বলল, আমার মনিব আর একটি বিয়ে করতে চাইছেন, কেননা তিনি আপনার প্রতি আর তেমন অনুরক্ত নেই। আপনি কি এ বিয়ে ঠেকাতে চান আর আপনার স্বামী আপনাকে আগের মতই ভালোবাসুক এটা চান , তাহলে উনি যখন নিদ্রা যাবেন, তখন একটা ছুরি দিয়ে তার কন্ঠনালীর উপরের একটা পশম কেটে নিয়ে নিজের কাছে রাখবেন।

অন্য দিকে মনিবকে সে বলল, আপনার স্ত্রী তলে তলে অন্য একজনের প্রতি আকৃষ্ট এবং তাকে তিনি ভালোবাসেন এবং তার সাথে চক্রান্ত করে তিনি আজ আপনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করবেন। আপনি যদি বাঁচতে চান তাহলে আপনি না ঘুমিয়ে কেবল ঘুমের ভান করে শুয়ে থেকে দেখবেন, আপনার স্ত্রী কিভাবে আপনার গলায় ছুরি চালায়।
গোলামের কথামত মনিব ঠিক তাই করল, রাতে যেই তার স্ত্রী ছুরি দিয়ে তার গলার পশম কাটতে উদ্যত হল, অমনি মনিব উঠে তার হাত থেকে ছুরি নিয়ে স্ত্রীকে সাথে সাথে হত্যা করল। এরপর স্ত্রীর আত্মীয়রা এসে মনিবকে হত্যা করল। এরপর উভয়পক্ষে তুমুল গন্ডগোল শুরু হল এবং এতে উভয় পক্ষ সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। এজন্যই আল্লাহ চোগলখোরকে ফাসিক বলে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ বলেন, 
“যদি তোমাদের কাছে কোন ফাসিক সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করে নাও। না জেনে যদি কারো অনিষ্ট সাধন কর, তাহলে পরিণামে তোমরা কষ্ট ভোগ করবে।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ০৬)